ট্রেনে যেতে যেতে
-সাবিয়া সুলতানা
রমণবাবু সকাল থেকেই ভারী ফূর্তিতে রয়েছেন , জিজ্ঞেস করলাম – কি হে মশাই খোশমেজাজেই আছেন দেখছি ! চায়ে চুমুক দিয়ে তিনি উত্তরে বললেন : ঠিক বলেছ অপরেশ , আজ সকাল থেকেই মনটা বেশ অন্যরকম হয়ে আছে , মনে পড়ে যাচ্ছে ভ্রমণে যাওয়ার বেশ কিছু স্মৃতি। আজ আবহাওয়াটাও ঠিক যেন ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই অতীতে। বুঝলে অপরেশ , কিছু চেনা গন্ধ পাচ্ছি আজ , খুব চেনা । এই চেনা গন্ধ গুলো আরো বেশি মনে পড়িয়ে দিচ্ছে সেই সব পুরোনো দিনগুলির কথা। আমি বললাম : ( অপরেশবাবু ) তাহলে আজ চায়ের আড্ডা জমবে ভালোই , কি বলেন শ্যামলবাবু? শ্যামল বাবু এই ফাঁকে তিনজনের জন্য ছয় কাপ চা অর্ডারও দিয়ে ফেলেছেন; তবে যা মনে হচ্ছে তাতে গল্প কিন্তু বেশ লম্বা চলবে। এইভেবেই তাকিয়ে রইলাম রমণবাবুর দিকে; তিনি দুইবার কেশে নিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে শুরু করলেন তাঁর ভ্রমণ কাহিনী - সেই দিনটি ছিল সোমবার। অফিস থেকে লম্বা ছুটি পেয়েছিলাম, তাই ভাবলাম ভ্রমণে যাওয়া যাক, আর আমি তো তখন একা মানুষ, কোনো পিছুটান ছিলনা। কাজের চাপে কিছুদিন বড্ড প্রেসার পড়ে গেছিল, তাই সাত-পাঁচ বেশিকিছু না ভেবে সেইদিনই পিঠে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কোথায় যাব কিচ্ছু জানিনা, তবে দার্জিলিং যাওয়ার খুব শখ ছিল আমার, তাই ভাবলাম উত্তরের দিকেই যাওয়া যাক। ট্রেনের টিকিটটা কেটে, পকেটে রেখে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি, কিছুক্ষণের মধ্যেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ট্রেনে চাপলাম। তখন খুব ভিড় ছিল না। তাই বসার জায়গাটা খুব সহজেই পেয়ে গেলাম। পরে অবশ্য ভিড় বাড়তে থাকলো। হঠাৎই কিসের যেন একটা সুর শুনতে পেলাম, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে বিশেষ কিছু দেখা যাচ্ছে না । বসে বসে ভাবছিলাম বাদ্যযন্ত্রটি বড়ই অদ্ভুত ধরণের, সুরটাও খুব অচেনা। শব্দটা মনে হচ্ছে অনেক কাছে চলে এসেছে, বুঝতে পারলাম এই দিকেই আসছে । কোনো এক বাউল সাধক, বেশ সুন্দর গানও করেন। শ্যামলবাবু খুব কৌতূহলী হয়েই জিজ্ঞেস করলেন "অদ্ভুত বাদ্যযন্ত্রটি কি ছিল?" রমণবাবু বললেন— ওটা কোনো বাদ্যযন্ত্র ছিল না, দুটি মসৃণ পাথর বেশ কায়দা করে একটি হাতের মধ্যে রেখে বাজাচ্ছিলেন উনি, আর অন্য হাতে ছিল খুব পুরোনো একটি একতারা। তবে ওটা বিশেষ বাজাতে দেখলাম না ওনাকে। শ্যামল বাবু আবার বলে উঠলেন ভারী অদ্ভুত ব্যাপার তো! দুটি পাথর? পাথর বাজাচ্ছিলেন উনি! শুনিনি কখনো; এই বলে উনি চায়ের কাপ ডাস্টবিনে ফেলে কৌতূহল ভরে ঘুরে বসলেন রমণবাবুর দিকে। শ্যামলবাবু যে এক গল্পপ্রেমী মানুষ তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তার চোখমুখ দেখে। রমণবাবু আবার বলতে শুরু করলেন এবার পৌঁছে গেলাম আমার প্রিয় পাহাড়ী অঞ্চলে (দার্জিলিং)। একটি হোটেলেরও ব্যবস্থা হয়ে গেল খুব সহজেই। তাই আর দেরি না করে ব্যাগটা রুমে রেখে, একটু ফ্রেস হয়েই বেরিয়ে পড়লাম। হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে মাঝে মধ্যেই, আর সঙ্গে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি । খুব মনোরম পরিবেশ। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম একটা ছোট্ট পাহাড়ের কাছে, পাহাড়টির ঠিক নীচের অংশতেই বেশ বড়ো বড়ো পাথরের গর্ত রয়েছে, তবে সেটা গুহা বলা যায়না। সেখানেই ভাবুকের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। বিভিন্ন পাখি আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে, তাদের আবার বিভিন্ন রকমের ডাক, হাওয়ার গতিটা আগের তুলনায় বেশ অনেকটাই বেড়েছে, আর বৃষ্টি পড়াটা প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। আমার বাম পাশেই কোমর পর্যন্ত উচ্চতার একটি পাথর ছিল। ওটা চোখে পড়তেই গিয়ে বসলাম পাথরটার উপর। প্রায় একঘন্টা পর আমার সামনে একটা বুনো বিড়াল এসে উপস্থিত। দেখে একটু ঘাবড়েই গেলাম, হঠাৎ করে কোথা থেকে চলে এল ঠিক বুঝতে পারলাম না। বেড়ালটা কেমন যেন রহস্যজনক ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল আর জোরে জোরে লেজ নাড়াচ্ছিল । মনে হলো ও যেন আমার সঙ্গী হতেই এসেছে; একা বসেছিলাম কিনা ! ওকে মানুষের মতোই জিজ্ঞেস করলাম, কি রে! তুই এই পাহাড়েই থাকিস নাকি? ভয় করেনা তোর একা এখানে থাকতে? যাবি আমার সাথে ঘুরতে? ও লেজ নাড়াতে থাকলো, মনে হলো, ও যেন সবই বুঝতে পারল আমার কথা। আমি উঠে ওর কাছে গিয়ে গায়ে আলতো ভাবে হাত বুলিয়ে বললাম "একটা ভালো জায়গায় নিয়ে যাবি রে আমায়?" ও হাঁটতে শুরু করল পাহাড়ের পাশের রাস্তায়, আমিও গেলাম ওর পেছনেই। তারপরই ঘটে গেল এক রহস্যময় ঘটনা। আমার সামনে কয়েক পা এগোলেই একটি বড়ো খাদ। ভয়ের থেকে অবাকই হলাম বেশী, দেখলাম সেই বাউল সাধক যার বাজানো সুর শুনেই আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। খাদের ঠিক ওপারে উনি, সেই একই ধরনের সুর কিন্তু এবারের সুরটা খুবই তীব্র ও তীক্ষ্ণ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে ধাক্কা দিয়ে কেউ যেন দৌড়ে চলে গেল। আমি চমকে উঠলাম, এ কি! আমি তো ট্রেনে, তবে ট্রেনটা এখন আর চলন্ত অবস্থায় নেই। বেশ বুঝতে পারলাম আমি এতোক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম। বিশেষ কারণবশত ধর্মঘট ছিল সেইদিন তাই অর্ধেক রাস্তা গিয়ে ট্রেন দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। সবাই ভেবেছিল কিছুক্ষণ পর হয়তো ট্রেন আবার চলবে কিন্তু তা আর হলো না, বাধ্য হয়েই সবাই তাড়াহুড়ো করে আবার অন্য উপায়ে বাড়ী ফেরার রাস্তা খুঁজছিল। আর এই জন্যই আমার স্বপ্নটা গেল ভেঙে। আমিও উঠে পড়লাম, আর মনে মনে একটু হাসিও পেল, এ কি ধরনের স্বপ্ন কান্ড তা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। তবে যেরকমই হোক না কেন, স্বপ্নে কিন্তু মনের সাধটা কিছুটা হলেও পূর্ণ হল; তবে অদ্ভুত উপায়ে। হয়তো ক্লান্তি আর ঘুরতে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছার ফলস্বরূপ আমার এই স্বপ্ন। আর বেশীকিছু না ভেবে ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা স্পেশাল ট্রেন এলো, আটকে পড়া যাত্রীদের আবার নিজেদের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সব যাত্রীর এখন ভরসা এই স্পেশাল ট্রেন। তাই আমি ভিড়ের মধ্যে না গিয়ে সব শেষে উঠলাম কামরায়, ঠিক দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর ট্রেন তার আপন গতিতে আমায় আবার বাস্তব জীবনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে চলল। হঠাৎই দৃষ্টি পড়ল কিছুটা দূরে সেই বাউল সাধকের দিকে, আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে হাত নাড়াচ্ছে, যেন সে আমার স্বপ্নের কথা সব জানে। আমিও চলন্ত ট্রেন থেকে অসহায়ের মতো অবাক দৃষ্টিতে তাঁকে বিদায় জানিয়ে স্টেশন থেকে চলে গেলাম বহুদূর। বাউল সাধক কোথায় যেন মিলিয়ে গেলেন। এক অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলাম আমি। বাস্তব আর স্বপ্নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রহস্য যেন খিলখিলিয়ে হেসে উঠল!!
Comments
Post a Comment